সকল আম্বিয়াদের মধ্যে নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে “খলিলুল্লাহ”—অর্থাৎ আল্লাহর বিশেষ বন্ধু—এই উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) কীভাবে এই সম্মানসূচক উপাধি লাভ করেছিলেন, সে সম্পর্কে আল্লামা ইবনু কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) নিম্নলিখিত ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন:
নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর একটি বরকতময় অভ্যাস ছিল যে, তিনি সবসময় তাঁর সাথে খাবার ভাগ করে নেওয়ার জন্য বাড়িতে মেহমান হিসেবে লোক নিয়ে আসতেন। একবার নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) বাড়িতে মেহমান হিসেবে নিয়ে আসার জন্য কাউকে খুঁজতে বের হলেন। কিন্তু তিনি তাঁর সাথে খাবার ভাগ করে নেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পেলেন না আর তাই তিনি বাড়ি ফিরে এলেন।
বাড়িতে পৌঁছে তিনি দেখলেন যে, তাঁর অনুপস্থিতিতে একজন লোক ভেতরে প্রবেশ করেছে এবং দাঁড়িয়ে আছে। নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর বান্দা! তুমি অনুমতি ছাড়া আমার ঘরে কেন প্রবেশ করলে?” লোকটি উত্তর দিল, “যিনি আপনার ঘরের প্রকৃত মালিক, তিনিই আমাকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছেন (অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা আমাকে অনুমতি দিয়েছেন)।”
এ কথা শুনে নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কে?” সে উত্তর দিল, “আমি মৃত্যুর ফেরেশতা। আমার রব আমাকে তাঁর এক বান্দার কাছে এই সুসংবাদ দিতে পাঠিয়েছেন যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে তাঁর ‘খলীল’ (বিশেষ বন্ধু) হিসেবে মনোনীত করেছেন।”
নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞেস করলেন, “এই বিশেষ ব্যক্তিটি কে?আল্লাহর কসম, আপনি যদি আমাকে তার পরিচয় জানান, তবে আমি অবশ্যই তার কাছে যাব – সে যদি দূরতম কোনো দেশেও বাস করে। এরপর মৃত্যু আমাদের পৃথক না করা পর্যন্ত আমি তার সাথেই থাকব।” তখন মৃত্যুর ফেরেশতা বললেন, “তুমিই সেই বিশেষ বান্দা।”
নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) আনন্দে অভিভূত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি কি সত্যিই সেই বিশেষ ব্যক্তি?” যখন ফেরেশতা নিশ্চিত করলেন যে তিনি সেই ব্যাক্তি, তখন নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞাসা করলেন, “আল্লাহ তা‘আলা কেন আমাকে তাঁর খলীল বানালেন?” ফেরেশতা উত্তর দিলেন, “এর কারণ হলো, তুমি সবসময় মানুষকে দান করো এবং মানুষের কাছে কখনো কিছু চাও না।” (তাফসীর ইবনু কাসীর ২/৩৭৫)
যখন আমরা এই ঘটনাটি অধ্যয়ন করি, তখন আমরা দেখতে পাই যে নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর জীবনের যে দিকটি আল্লাহ তা‘আলার কাছে প্রিয় ছিল, তা হলো তাঁর একটি সহানুভূতি ও করুণাময় হৃদয় ছিল। তিনি সবসময় অন্যদের সাথে ভাগ করে নিতে এবং কোনো প্রতিদান আশা না করেই তাদের সাহায্য করতে ইচ্ছুক ছিলেন।
নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর হাতে অগ্নিপূজকের ইসলাম গ্রহণ
বর্ণনা করা হয়েছে যে, একবার একজন অগ্নিপূজক নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে এসে খাবার চাইল। নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) তাকে বললেন, “যদি তুমি ইসলাম গ্রহণ করো, আমি তোমাকে খাওয়াবো।” এ কথা শুনে অগ্নিপূজকটি মুখ ফিরিয়ে চলে গেল।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে ওহী প্রেরণ করে বললেন, “হে ইব্রাহিম! তুমি তাকে খাওয়াতে চাও না,কারণ সে মুসলিম নয় এবং ইসলাম গ্রহণ করেনি। অথচ, সে কাফের হওয়া সত্ত্বেও আমরা তাকে সত্তর বছর ধরে খাইয়ে আসছি। তুমি তাকে অন্তত এক রাতের জন্যেও কেন খাওয়ালে না?”
নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) তৎক্ষণাৎ অগ্নিপূজকটিকে খুঁজতে গেলেন, তাকে ডেকে ফিরিয়ে আনলেন এবং খাওয়ালেন। এরপর অগ্নিপূজকটি নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে জিজ্ঞাসা করল, “কী কারণে আপনি আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে আমাকে খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন?”
নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) উত্তর দিলেন, “আল্লাহ তা‘আলা আমায় তোমাকে খাওয়ানোর আদেশ দিয়েছেন,” এবং নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) সেই অগ্নিপূজককে তাঁর প্রাপ্ত ওহী এবং আল্লাহ তা’আলা তাঁকে যা বলেছেন, সে সম্পর্কেও জানালেন।
নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর কথা শুনে অগ্নিপূজক গভীরভাবে প্রভাবিত হলো এবং জিজ্ঞাসা করল, “এটাই কি সেই অসীম অনুগ্রহ যা আল্লাহ তা‘আলা আমার প্রতি করেছেন?”
তারপর সে বলল, “দয়া করে আমার কাছে ইসলাম পেশ করুন, যাতে আমি তা গ্রহণ করতে পারি।” অতঃপর নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) তার কাছে ইসলাম পেশ করলেন, যার পরে সে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান আনল। (ইহইয়াউ উলুমিদ দীন ৪/১৫৪)
Alislaam – বাংলা