মূর্তিপূজক ও কাফিরদের পথের বিরোধিতা
নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল মূর্তিপূজক ও কাফিরদের পথের এমন এক অনন্য উপায়ে বিরোধিতা করা, যে তিনি তাদের পথের দিকে সামান্যতমও ঝুঁকে পড়েননি।
সুতরাং, রসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম)-এর উম্মতকে তাঁর জীবনের এই দিকটি অনুসরণ করার এবং এইভাবে ইসলামের আদি পবিত্রতা রক্ষায় তাঁকে অনুকরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) তার লোকদেরকে, যারা মূর্তিপূজক ছিল, সবচেয়ে স্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন:
إِنَّا بُرَآءُ مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ
আমরা তোমাদের থেকে এবং তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ইবাদত কর তাদের থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করছি। আমরা তোমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছি। আমাদের এবং তোমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছে, যতক্ষণ না তোমরা একমাত্র আল্লাহকে বিশ্বাস করো। (সূরা মুমতাহিনা, আয়াত ৪)
অনুরূপভাবে, যখন তিনি তাঁর পিতা ও সম্প্রদায়কে ত্যাগ করছিলেন, তখন তিনি তাদেরকে স্পষ্টভাবে সম্বোধন করে বললেন:
وَأَعْتَزِلُكُمْ وَمَا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ
আমি তোমাদেরকে এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমরা যা কিছুকে (দোয়ায়) ডাকো,তা ত্যাগ করছি… (সূরা মারইয়াম, আয়াত ৪৮)
নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর এই অবস্থান—অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রকাশ করা, সেইসাথে কুফর ও শিরকের অনুসারীদের থেকে নিজেকে পৃথক রাখা, তাদের পথের বিরোধিতা করা এবং তাওহীদের মূলনীতিকে সমুন্নত রাখা—আল্লাহ তা‘আলার কাছে এতটাই প্রিয় ছিল যে, আল্লাহ তা‘আলা এটিকে রসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম)-এর শরীয়তের অংশ করে দিয়েছেন।
২. হযরত নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর কিবলা
আল্লাহ তা‘আলা রসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম)-এর উম্মতকে নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর কিবলার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করার আদেশ দিয়েছেন।
ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে, সালাত আদায়ের সময় তাদেরকে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মতের কিবলা হিসেবে নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর কিবলাকেই মনোনীত করেছেন – যিনি এই উম্মতের পাশাপাশি ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরও পূর্বপুরুষ।
হাদীসে লিপিবদ্ধ আছে যে, আল্লাহ তা‘আলা আমাদের উপর কিছু বিশেষ অনুগ্রহ বর্ষণ করায় ইহুদি ও খ্রিস্টানরা আমাদের উম্মতের প্রতি ঈর্ষান্বিত। এই বিশেষ অনুগ্রহগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ইসলামের কিবলা – কাবা শরীফ। (মুসনাদ আহমদ #২৫০২৯)
কাবা শরীফকে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রথম ঘর হওয়ার গৌরব দান করা হয়েছে,যা নবী আদম (আলাইহিস সালাম) নির্মাণ করেছিলেন, এবং একারণে এটি ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কিবলার চেয়েও শ্রেষ্ঠ।
নবী নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর সময়ে সংঘটিত মহাপ্লাবনের সময় কাবা শরীফের সম্পূর্ণ কাঠামো আকাশে উঠে গিয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে কাবা শরীফ পুনর্নির্মাণের মহান সম্মান দান করেন।
এছাড়াও, যখন বায়তুল মুকাদ্দাসের কিবলার বিপরীতে কাবা শরীফকে দেখা হয়, তখন উপলব্ধি করা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা একে সর্বশ্রেষ্ঠ পুণ্য ও পুরস্কার দান করেছেন।
কাবা শরীফ (অর্থাৎ সমগ্র হারাম) এর আশেপাশে এক সালাত আদায় করার ফজিলত ও সওয়াব অন্যান্য মাসজিদে এক লাখ সালাত আদায়ের সমতুল্য, অথচ যে ব্যক্তি মসজিদে নববী বা বায়তুল মুকাদ্দাসে (ইহুদী ও খ্রিস্টানদের কিবলা) সালাত আদায় করে সে অন্যান্য মাসজিদ পঞ্চাশ হাজার সালাত আদায়ের সওয়াব লাভ করে। (সুনানে ইবনু মাজাহ #১৪০৬)
৩. হজ্জের রীতি
রসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম) এর উম্মতকে যেমন সালাতে নবী ইব্রাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর কিবলা অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তেমনি রসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম)-এর উম্মতকে হাজ্জের আনুষ্ঠানিকতা পালনেও নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর পরিবারের অনুকরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বরকতময় হাদিসে বর্ণিত আছে যে,হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) বায়তুল্লাহতে এসে কাবা শরীফের তাওয়াফ করেন এবং এরপর সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাঈ করেন।
অন্য একটি বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, হযরত জিবরীল (আলাইহিস সালাম) হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে মিনায় নিয়ে যান, যেখানে তিনি যোহর, আসর, মাগরিব, এশা এবং পরদিনের সকালের ফজরের সালাত আদায় করেন।
এরপর, হযরত জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে আরাফাতে নিয়ে যান, যেখানে তিনি যোহর ও আসরের সালাত আদায় করেন এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত উকুফ (দোয়া, যিকির ইত্যাদিতে) করেন। সূর্যাস্তের পর, হযরত জিবরীল (আলাইহিস সালাম) হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-কে নিয়ে মুযদালিফার দিকে রওনা হন এবং সেখানে রাত্রিযাপন করেন।
পরদিন সকালে, হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) সালাত দীর্ঘ না করে সংক্ষেপে ফজরের সালাত আদায় করলেন এবং তারপর হযরত জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে মিনায় গমন করলেন, যেখানে তিনি জামারাতগুলোতে পাথর নিক্ষেপ করলেন, তাঁর কুরবানির পশুটি জবাই করলেন এবং মাথা মুণ্ডন করলেন। আল্লাহ তা‘আলা রসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম)-এর প্রতি এই আদেশ অবতীর্ণ করলেন, “হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর মিল্লাত (পথ) অনুসরণ করুন।” (মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবা #১৪৯২০)
অতএব, হাজী যখন মক্কা মুকাররমায় গমন করেন, বায়তুল্লাহর সামনে তাওয়াফ করেন, সাঈ করেন, মিনায় অবস্থান করেন, আরাফাত ও মুযদালিফায় ওকূফ করেন, জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করেন, কোরবানির পশু জবাই করেন এবং মাথা মুণ্ডন করেন – তখন এ সবই হযরত ইব্রাহীম (আলাইহিস সালাম) -এর হাজ্জের বরকতময় আমল।
৪. নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) এর অনুকরণে কুরবানী
হাজ্জের আচার-অনুষ্ঠান যেমন নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর অনুকরণে, অনুরূপভাবে রসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম)-এর উম্মত কুরবানী পালন করে।ঈদুল আযহার উপলক্ষটিও আল্লাহর এই মহান নবী- হযরত নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর অনুকরণে পালিত হয়।
বর্ণিত আছে যে, একবার সাহাবীগণ (রাদ্বীয়াল্লাহু আনহুম) হযরত রসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রসুল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম)! এই কোরবানির (অর্থাৎ ঈদের এই উপলক্ষে কোরবানির পশু জবাই করার) তাৎপর্য কী?” হযরত রসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম) উত্তর দিলেন, “এটা তোমাদের পিতা, হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর সুন্নাহ।” (সুনান ইবনু মাজাহ #৩১২৭)
৫. খতনার (মুসলমানি) সুন্নাহ পালন করা
দ্বীনে আমাদেরকে খতনার (মুসলমানি) সুন্নাহ পালন করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম ব্যক্তি যাঁকে আল্লাহ তা‘আলা খাতনা পালনের জন্য আদিষ্ট হয়েছিলেন, তিনি হলেন নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)। (মুয়াত্তা মালিক #৪)
Alislaam – বাংলা